জীবনবোধ : চিন্তায় চেতনায়
- পাপন বসুনিয়া
আমি দেখি— সন্ধ্যার ধুলোমাখা আলোর নিচে একটানা হেঁটে চলে গেছে এক জীবন,
সে জানে না— সে কীভাবে বেঁচে ছিল, কবে ভেবেছিল আত্মাকে ছুঁয়ে দেখবে,
একাকী দুপুরে জানলার গায়ে হেলান দিয়ে, কেউ হয়তো খুঁজেছে সময়ের রূপ;
আমিও খুঁজি— প্রাচীন বৃক্ষের ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকা এক মৌন বোধ—
যেখানে শব্দেরা কথা বলে না, তবু বুকে ঢেউ তোলে দীর্ঘশ্বাসের মতো।
একদিন আমি এক মৃত পাখির চোখে খুঁজেছিলাম নিজের প্রতিবিম্ব—
তুমি বলেছিলে— বাঁচা মানে কেবল হেঁটে যাওয়া নয়, চিন্তার ভিতরে ডুবে থাকা,
আমি বুঝিনি— চেতনারও আছে হাহাকার, তারাও একা হয়ে পড়ে বিষণ্ন রাতের মতো;
আজ জানি— এই যে পথ, এই যে সময়ের ভিতর অজস্র ঘূর্ণি—
তা আমাদের ছুঁয়ে যায়, ভাসিয়ে নিয়ে যায় এক নিঃশব্দ দিগন্তে।
জীবন যদি হয় এক বহতা নদী, তবে জীবনবোধ তার গভীর জলধারা—
যেখানে প্রশ্নেরা ডুবে যায়, উত্তরেরা রয়ে যায় কাদার নিচে জমে থাকা চিহ্ন হয়ে;
আর আমরা? আমরা তো কেবল হেঁটে যাই— একটা ছায়া নিয়ে, কিছু প্রলাপ,
ভেবেছিলাম চিন্তা এক সময় থেমে যাবে— অথচ চেতনায় জেগে ওঠে নতুন বিস্ময়—
আর সেই বিস্ময়ই, প্রিয়, একদিন আমাদের ঘুম পাড়ায় শুয়ে থাকা শূন্যতার বুকে।
আমি হেঁটে যাই রাতের শহরে, যেখানে বাতি জ্বলে— আবার নিভে যায়,
সেই আলো— কি এক ব্যথার মতো আসে, ছুঁয়ে দেয় ফেলে আসা দিনের শরীর—
আমার ছায়া দীর্ঘ হয়, অথচ আমি নিজেই নিজের ভিতর ধ্বংসপ্রায়।
জীবন এক ক্লান্ত কবিতার মতো, যেন এক মৃত্যু-সন্ধিক্ষণে লেখা পঙ্ক্তিমালা,
যার প্রতিটি অক্ষর খুঁড়ে আনে এক নিঃশব্দ জন্মের পূর্বস্মৃতি।
তুমি কি জানো— এই যে চেতনা,
যা আমাদের ভাসিয়ে রাখে অথচ ডুবিয়েও দেয় নিঃশেষের মতো—
এ এক কুয়াশার দেশ, যেখানে বাস্তব আর অবাস্তব হাত ধরাধরি করে হেঁটে যায়;
আমি লিখি— আবার কাটিয়ে ফেলি, আমি ভাবি— আবার বিস্মৃত হই,
তবুও, এক কালের প্রান্তে দাঁড়িয়ে, আমি বিশ্বাস করি— জীবনবোধই শেষ সত্য।
তবুও আমি ভুলে যাই— এই যে পৃথিবী, তার প্রতিটি গন্ধ, প্রতিটি নিঃশ্বাস
কত সহজে আমাদের ফাঁকি দেয়; যে পাথরকে ছুঁয়ে দেখেছি ছেলেবেলায়,
আজ সে নেই— অথচ তার স্মৃতি রয়ে গেছে একটি কবিতার রেখায়—
এমনই তো জীবন, নাকি? ধরা দেয় না পুরোটা,
মেঘের মতো ফেলে যায় রূপ— আর রূপান্তরের পর গভীর শূন্যতা।
আমি বিশ্বাস করি, কখনো কখনো কিছু অনুভব শব্দে ধরা পড়ে না—
তবুও আমরা লিখি, ভাঙা কলমে, ছেঁড়া খাতায়, নিস্তব্ধ দুপুরে;
চেতনা যেন পাথরের নিচে চুপ করে থাকা জল—
যা হঠাৎ একদিন ছুঁয়ে দেয় অন্তর্গত দগ্ধতা, এক নিঃশব্দ আর্তনাদে—
তখনই হয়ত জন্ম নেয় জীবনবোধ, নামহীন, অথচ স্পষ্ট এক সত্তা হয়ে।
এই যে আমি— ভাবছি, লিখছি, ভুলছি আবার খুঁজে পাচ্ছি—
এ কি কেবল বেঁচে থাকা? না কি এক অন্তর্লীন যাত্রা?
আমি জানি না— শুধু জানি, এই অনিশ্চয়তার মাঝেই লুকিয়ে থাকে জীবনের কবিতা,
যেখানে ভাবনারা হাঁটে— দীর্ঘ পথ, নিঃসঙ্গ আকাশের নিচে—
আর আমিও হাঁটি, শব্দের ভিতর নিজেকে হারিয়ে রেখে,
জীবনবোধ হয়ে— তোমারই কোনো অলিখিত চেতনায়।
২৬-০১-২০২৬
রকমারি থেকে বই কিনুন
মন্তব্যসমূহ
এখানে এপর্যন্ত 1টি মন্তব্য এসেছে।

মন্তব্য যোগ করুন
কবিতাটির উপর আপনার মন্তব্য জানাতে লগইন করুন।